ইদুল ফিতরের পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে ফোনকলটি করেছেন, সেটি কেবল একটি সৌজন্য যোগাযোগ নয়, রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থানের নগ্ন পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। জুলাই গণহত্যার অন্যতম সহযোগী হিসেবে চিহ্নিত আনিস আলমগীরকে ব্যক্তিগত খোঁজখবর নেওয়ার নামে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া কোনো উদারতা নয়, এটি ইনসাফের কবরের ওপর দাঁড়িয়ে ক্ষমতার দাম্ভিক হাসি।
রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী যখন একজন “সহযোগী খুনী”-কে ফোন করেন, তখন তিনি ব্যক্তিগত পরিচয়ের গণ্ডি পেরিয়ে একটি রাজনৈতিক বার্তা পাঠান খুনের বয়ান তৈরিকারীরা এখন আর প্রান্তিক নয়, তারা ক্ষমতার অভ্যন্তরে গ্রহণযোগ্য। এটা পৃথিবীর কোনো গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে শিষ্টাচার হিসেবে গণ্য হতে পারে না; এটি ন্যায়বিচারকে অপমান করার এক নির্মম পদ্ধতি।
জুলাইয়ের ১৪০০ শহীদ ও ২৫,০০০ আহতের রক্তের বিনিময়ে যে রাষ্ট্র আজ রাজনৈতিকভাবে নতুন বৈধতা দাবি করছে, সেই রাষ্ট্রের প্রধান কর্মকর্তা সেই গণহত্যার বৈধতা উৎপাদনকারীদের একজনকে বুকে টেনে নেওয়া মানে শহীদদের স্মৃতির ওপর প্রকাশ্য থুথু নিক্ষেপ। যাদের ত্যাগ তাকে দীর্ঘ নির্বাসন-জীবন থেকে দেশে ফেরার রাস্তা তৈরি করেছে, তাদেরই হত্যার সহযোগীকে ফোনে আশীর্বাদ দেওয়া নিছক রাজনৈতিক ভুল নয় এটা সরাসরি বিট্রেয়াল।
এর সামাজিক প্রভাব ভয়াবহ। আজ থেকে আনিস আলমগীররা বুক ফুলিয়ে ঘুরবে, “জুলাই নিয়ে ব্যবসা”, “জুলাই যোদ্ধাদের গালি”, “খুনের বৈধতা”এসব বয়ান আরও সংগঠিতভাবে ছড়াবে, কারণ তারা জানবে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আসন থেকে তাদের ওপর কোনো নৈতিক চাপ নেই, বরং নীরব মদদ আছে। এই ফোনকল কার্যত সহযোগী খুনীদের জন্য সামাজিক ইমিউনিটি, একটি রাজনৈতিক বর্ম জোগাড় করে দিল।
আইনি কাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে যদি এইসব “সহযোগী খুনী”দের আদালতে দাঁড় করানো এই মূহূর্তে সম্ভব না-ও হয়, তবুও রাষ্ট্রের ন্যূনতম দায়িত্ব ছিল তাদের সামাজিকভাবে অস্ট্রাসাইজ করে রাখা, যেন তারা জনপরিসরে মাথা তুলে দাঁড়ানোর সাহস না পায়। কিন্তু যখন প্রধানমন্ত্রী নিজেই ফোন করে খোঁজখবর নেন, শুভেচ্ছা জানান, তখন সেটি গণমানুষের প্রতি ভয়াবহ ডিসসার্ভিস, শহীদ পরিবারগুলোর কাটা গায়ে নুনের ছিটা।
আরও অপমানজনক হলো, জুলাইয়ের শহীদ ও আহতরা আজও বিচারের আশায় প্রহর গুনছেন, তাদের ক্ষত এখনও সেলাইহীন পড়ে আছে, সেখানে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বিচারকে ত্বরান্বিত করার কোনো দৃশ্যমান তৎপরতা নেই। উল্টো দেখা যাচ্ছে, একই রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী সেই খুনের বয়ান রচয়িতাদের একজনকে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন, যেন বার্তা দেওয়া হচ্ছে “জুলাইয়ের রক্তের চেয়ে ক্ষমতার হিসাব বই অনেক বড়।”
রাষ্ট্র যখন তার বিচারিক কাঠামোর সীমাবদ্ধতার অজুহাতে খুনের সহযোগীদের আইনি জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তখন অন্তত নৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করার দায়িত্ব তার উপর ফরজ হয়ে যায়। ন্যূনতম ইনসাফ বলে, এইসব সহযোগীরা যেন সামাজিকভাবে পরিত্যক্ত থাকে, তাদের সামনে দরজা বন্ধ থাকে, জনমঞ্চে তাদের জায়গা না থাকে। তার উল্টো কাজটাই আজ করা হয়েছে: একজন সহযোগী খুনীকে রাষ্ট্রীয় বৈধতার সার্টিফিকেট দেওয়া হয়েছে একটি ফোনকলের মাধ্যমে।
এই মুহূর্তে তারেক রহমানের ফোন শুধু আনিস আলমগীরকে ‘মানুষ’ করছে না; এটি জুলাই গণহত্যার বয়ানকে রাজনৈতিকভাবে ‘স্বাভাবিক’ করে দিচ্ছে। ইতিহাস এই কলকে কোনোদিন নরম ভাষায় মনে রাখবে না এটিকে লেখা হবে জাতির শহীদদের সাথে এক ঠান্ডা মাথার রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে।











