কড়াইল বস্তিতে অনলাইন মাদক সিন্ডিকেট: ছদ্মবেশী ‘নাডা’ রুবেল অধরা, ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী

বনানী (ঢাকা) প্রতিনিধি:  

রাজধানীর বনানী থানাধীন কড়াইল বস্তিতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক অভিযানের পরও বারবার অধরাই থেকে যাচ্ছেন মাদকের মূল হোতারা। বস্তির বেলতলা এলাকায় ভয়ংকর অনলাইন মাদক সিন্ডিকেটের নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ছেন কামরুজ্জামান রুবেল ওরফে ‘নাডা’ রুবেল। ইয়াবা, হেরোইন এবং ব্যয়বহুল মাদক আইস (ক্রিস্টাল মেথ) কারবারের অন্যতম নিয়ন্ত্রক হয়েও সে বারবার থেকে যাচ্ছে ছোঁয়ার বাইরে।

 

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নিয়মিত মাদকবিরোধী পোস্ট দিয়ে নিজেকে ‘সাধু’ প্রমাণের চেষ্টা করলেও বাস্তব চিত্র পুরোই ভিন্ন। অনুসন্ধানে জানা যায়, রুবেল নিজেকে স্থানীয় যুবদল নেতা হিসেবে পরিচয় দিয়ে এলাকা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে। তবে অনুসন্ধানে যুবদলের কোনো কমিটিতে তার পদপদবির প্রমাণ পাওয়া যায়নি; বরং স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠ চলাফেরা দৃশ্যমান। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক ছায়াতলে থেকেই সে নিজের অপরাধের সাম্রাজ্য টিকিয়ে রেখেছে।

 

‘নাডা’ রুবেলের মাদক সিন্ডিকেটের মূল গ্রাহক গুলশান ও বনানী এলাকার প্রভাবশালী ও আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী ব্যক্তিরা। সন্ধ্যার পর থেকে ভোররাত পর্যন্ত অনলাইনে চলে তার মাদক কারবার। ফোনে অর্ডার পেলেই হোম ডেলিভারির মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া হয় ইয়াবা, হেরোইন কিংবা আইস। সে নিজেও নিয়মিত ইয়াবা, গাঁজা ও মদ সেবনে অভ্যস্ত।

 

রুবেলের এই বেপরোয়া সাম্রাজ্যের পেছনে অন্যতম অস্ত্র হিসেবে কাজ করে পুলিশ সোর্স হিসেবে তার কথিত পরিচয়। কোনো স্থানীয় বাসিন্দা বা প্রতিদ্বন্দ্বী তার বিরুদ্ধে মুখ খুললে বা পথের কাঁটা হলে, তাকে মাদক দিয়ে ফাঁসিয়ে পুলিশের হাতে ধরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নামে-বেনামে ফেক আইডি খুলে চালানো হয় চরিত্রহনন ও অপপ্রচার। মুখ খুললেই চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের নিয়ে অস্ত্র ঠেকিয়ে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়।

 

সম্প্রতি বনানী থানা পুলিশ রুবেলের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ইয়াসিনকে অস্ত্র, চাঁদাবাজি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগে গ্রেপ্তার করেছে। ইয়াসিনের গ্রেপ্তারের পর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের ফেসবুক পেজে নিউজ পোস্ট করা হলে রুবেল কমেন্ট সেকশনে গিয়ে দাবি করে—স্থানীয় এক বিএনপি নেতা ইয়াসিনকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়েছেন। অথচ মূল সহযোগীকে বাঁচাতেই রুবেলের এই নতুন কৌশল বলে নিশ্চিত করেছেন স্থানীয়রা।

 

কড়াইল বস্তির বেলতলা এলাকার এক সাধারণ ব্যবসায়ী (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) আক্ষেপ করে বলেন, “রুবেলের অত্যাচারে আমরা অতিষ্ঠ। মুখ খুললেই বাসায় অস্ত্র ঠেকিয়ে লুটপাট হয়, নয়তো থানায় সোর্স পরিচয় দিয়ে মাদক মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়। পুলিশ যদি সত্যিই ওকে গ্রেপ্তার করতে চায়, তবে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যাপার। কিন্তু অদৃশ্য শক্তির জোড়ে সে পার পেয়ে যায়।”

 

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা ও স্থানীয় প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে গুলশান বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) মোঃ সারোয়ার হোসাইন বলেন, “কড়াইল বস্তিতে মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বজায় রয়েছে। সোর্স পরিচয়ে বা কোনো রাজনৈতিক আশ্রয়ে কেউ পার পাবে না। ‘নাডা’ রুবেলের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

 

এদিকে অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, কেবল খুচরা বিক্রেতা বা সহযোগীদের গ্রেপ্তার করে কড়াইলের মাদক কারবার বন্ধ করা সম্ভব নয়। রুবেলের মতো ছদ্মবেশী মূল হোতাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের মুখোমুখি না করলে অভিজাত এলাকার এই অনলাইন মাদক চেইন ভাঙা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

আপনার মন্তব্য

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

অনুসরন করুন

সর্বশেষ খবর

আর্কাইভ

  • Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
     1234
    567891011
    12131415161718
    19202122232425
    262728293031