পরিবর্তনের নামে পুনরাবৃত্তি:আওয়ামিলীগের স্থানে বিএনপি

সাজন আহমেদ: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল(বিএনপি) এক সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও সাম্প্রতিক সময়ে দলটির কর্মকাণ্ড জনস্বার্থের চেয়ে দলীয় স্বার্থে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। আওয়ামীলীগ চলে গেলেও তাদের পুরোনো শাসনকে আকড়ে ধরেছে বিএনপি। এ যেন নতুন চেহারায় পুরোনো চরিত্র। এতে নেতৃত্বের পরিবর্তন হলেও আচরণে আওয়ামিলীগের স্থান দখলে নিয়েছে বিএনপি।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সারাদেশে বিএনপি’র কেন্দ্রীয় থেকে শুরু করে তৃণমূল নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশ নানাবিধ অনিয়ম, চাঁদাবাজি, সহিংসতা, প্রশাসন ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে তাদের নিজস্ব লোকবল নিয়োগ ও মামলাবাণিজ্য কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়েছে। যা শুধু দলটির ভাবমূর্তিকেই ক্ষুণ্ণ করছে না,  বরং দেশের সার্বিক শৃঙ্খলা,ও জণগনের নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ হয়ে উঠেছে।
উসকানিমূলক বক্তব্য, হুমকি,  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে  মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির প্রবণতা বিএনপির বর্তমান রাজনৈতিক কৌশলের অন্যতম বৈকশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। সর্বোপরি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচারের জন্য একটি গোপন ফোর্সও তৈরি করেছে দলটি। দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় প্রবাসীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দখল, সাধারণ ব্যবসায়ীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ সংগ্রহ, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের দিয়ে রাজপথে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং প্রশাসনের ওপর হামলার মতো কর্মকাণ্ডকে তারা ‘রাজনৈতিক আন্দোলন’ বলে আখ্যা দিলেও প্রকৃতপক্ষে এটি একটি সুপরিকল্পিত অপকৌশল, যার মাধ্যমে তারা জনবিচ্ছিন্নতা ঢাকতে চায়। গত ৫ই আগষ্ট আওয়ামিলীগের পতন ঘটলে আওয়ামিলীগের করা অপকর্ম থেকে রেহায় পায় নিস্তার পায় নি দেশের সর্বস্তরের মানুষ।
রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল, রাজশাহী, রংপুর, খুলনা ও ময়মনসিংহ প্রায় সব বিভাগেই বিএনপির অপতৎপরতা বিভিন্ন রূপে প্রকাশ পাচ্ছে। কোথাও তারা গুজব ও প্রপাগাণ্ডা ছড়িয়ে  উত্তেজনা সৃষ্টি করছে, কোথাও সরকারি প্রকল্পে বাধা দিচ্ছে, কোথায়ও হুমকি ধামকি দিয়ে  হাতিয়ে নিচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকা, আবার কোথাও পুলিশ ও প্রশাসনের কাজে বাধা ও মামলা বানিজ্য করে নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা করছে।
এই ধরণের ধারাবাহিক অপকর্ম শুধু রাজনৈতিক অস্থিরতা নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকেও বিপর্যস্ত করে তুলছে।  তারা সাধারণ জনগনকে জিম্মি করে গড়ে তুলছে নানা অপকর্ম।
এক স্বৈরাচার থেকে কি আরেক স্বৈরাচারের দিকে যাচ্ছে বাংলাদেশ এমন প্রশ্ন উঠছে নেটিজেনদের মধ্যে।
দেশের বিভিন্ন স্থানে এমন ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটেই যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জেলায় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির কিছু দৃষ্টান্ত উপস্থান করছি। এসব ঘটনায় স্থানীয় জনগণের মধ্যে উদ্বেগ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।

সিলেট: সিলেট নগরীর লালাদিঘীরপাড় এলাকায় এক ব্যবসায়ীর বাসায় গিয়ে বিএনপি ও যুবদলের কয়েকজন নেতাকর্মী ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। এ ঘটনায় ব্যবসায়ীর স্ত্রী কোতোয়ালি মডেল থানায় বিএনপি নেতা মিজানুর রহমান মিজান, আনোয়ার হোসেন, রাশেদ আহমদ, রুহেল আহমদ, আব্দুল মালেকসহ  অজ্ঞাত ১৫-২০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছেন। এছাড়া, সিলেট মহানগর যুবদলের সহ সাংগঠনিক সম্পাদক জয়দ্বীপ চৌধুরী মাধবের বিরুদ্ধে হকারদের কাছ থেকে চাঁদা দাবি এবং চাঁদা না দিলে হকারদের উঠিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তিনি হকার কাজল মিয়াকে অপহরণ করে ছুরি দেখিয়ে ১৬,৫০০ টাকা আদায় করেন এবং আরও ৩০,০০০ টাকা দাবি করেন বলে জানা গেছে।এছাড়া সিলেট নগরীর জিন্দাবাজারে দোকান সংস্কারের সময় ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগে বিএনপি নেতা আব্দুর রাজ্জাকসহ তিনজনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করা হয়েছে।  নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, চাঁদা না দেওয়ায় তার ওপর হামলা চালানো হয় এবং তার স্ত্রীর গলা থেকে স্বর্ণের চেইন ছিনিয়ে নেওয়া হয়।

মৌলভীবাজার: অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও চাঁদাবাজির অভিযোগ মৌলভীবাজারের রাজনগরে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য নুরুল ইসলাম সেলুনের ওপর গুলি, চাঁদাবাজি ও হামলার ঘটনায় ছাত্রদল-যুবদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। মামলায় ১৩ জনের নাম উল্লেখ ও ৪০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে।

এছাড়া, বড়লেখায় উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ফয়সল আহমদ সাগরের বিরুদ্ধে মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে ছয়জনের কাছ থেকে প্রায় ২ লাখ টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ সংক্রান্ত তথ্য ভাইরাল হয়েছে।

হবিগঞ্জ: মাদ্রাসার মাটি নেওয়া আটকে চাঁদা দাবি হবিগঞ্জের মাধবপুরে পারভেজ হোসেন চৌধুরী নামে এক বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে চাঁদার জন্য মাদ্রাসার মাটি নেওয়া আটকে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ইসলামী বক্তা শুয়াইব আহমদ আশ্রাফী ফেসবুক লাইভে এসে এ অভিযোগ করেন।
 এছাড়া, চুনারুঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ও এক বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে এক প্রবাসীকে মামলার ভয় দেখিয়ে ২ লাখ টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।

এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ ও উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করছেন, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের এমন ধরনের আচরণ ও কার্যকলাপ দলের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করছে। এতে রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি আস্থা হ্রাস পাচ্ছে এবং সাধারণ মানুষ একধরনের নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। বিশেষ করে যখন এসব ঘটনায় প্রশাসনের নির্লিপ্ততা বা পক্ষপাতমূলক আচরণের অভিযোগ উঠে, তখন সেই উদ্বেগ আরও গভীর হয়। স্থানীয়দের মতে, এসব কর্মকাণ্ড শুধুমাত্র একটি দলের জন্য বিব্রতকর নয়, বরং তা সামগ্রিকভাবে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে নড়বড়ে করে তুলছে এবং দীর্ঘমেয়াদে সমাজে অসন্তোষ ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। এই পরিস্থিতি দেশকে এক দীর্ঘস্থায়ী অস্বস্তিকর বাস্তবতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

আপনার মন্তব্য

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

অনুসরন করুন

সর্বশেষ খবর

আর্কাইভ

  • Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
     1234
    567891011
    12131415161718
    19202122232425
    262728293031