বনানীতে শহীদের ‘বিকল্প থানা’: সোর্স পরিচয়ে অপরাধের স্বর্গরাজ্য

ডেস্ক রিপোর্ট

রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানী। একদিকে যখন গ্ল্যামার আর কর্পোরেট চাকচিক্য, অন্যদিকে তখন ঝিলপাড় আর গোডাউন বস্তি এলাকাকে ঘিরে জেঁকে বসেছে এক ভয়ানক অপরাধ সাম্রাজ্য। আর এই সাম্রাজ্যের অঘোষিত সম্রাট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন ‘শহীদ’ নামের এক ব্যক্তি। নিজেকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ‘সোর্স’ পরিচয় দিয়ে বনানীতে সমান্তরাল এক প্রশাসন চালাচ্ছেন তিনি। মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, দখলবাজি থেকে শুরু করে আসামি কেনাবেচা—সবকিছুই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে শহীদের ইশারায়।

 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বনানী থানায় যখনই কোনো নতুন কর্মকর্তা বদলি হয়ে আসেন, সুকৌশলে তাদের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলেন শহীদ। পুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ করার আড়ালে তিনি মূলত নিজের অপরাধ নেটওয়ার্ককে সুরক্ষা দেন। এলাকাবাসীর অভিযোগ, থানার বাইরে শহীদের যেন নিজস্ব এক ‘বিকল্প থানা’ রয়েছে। কোনো আসামি গ্রেপ্তার হলে তাকে টাকার বিনিময়ে ছাড়িয়ে আনা কিংবা মামলা হালকা করার মধ্যস্থতা করেন তিনি। এমনকি অভিযানে জব্দ হওয়া মাদক পুলিশের একাংশের যোগসাজশে শহীদ আবার মাদক ব্যবসায়ীদের কাছেই বিক্রি করে দেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

 

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সাথে সাথে ভোল পাল্টাতে পটু এই অপরাধী। একসময় যুবলীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত থাকলেও, গত ৫ই আগস্টের পর থেকে তিনি নিজেকে বিএনপির নেতা হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেছেন। ক্ষমতার এই পালাবদলকে পুঁজি করে বনানীর ‘গোডাউন’ এলাকার অপরাধ সাম্রাজ্য নিজের দখলে নিয়েছেন তিনি। নিরীহ মানুষের ঘরবাড়ি দখল, ঝিল ভরাট করে অবৈধ গ্যারেজ নির্মাণ এবং ফুটপাত থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় এখন তার নিত্যনৈমিত্তিক কাজ।

 

শহীদের প্রধান আয়ের উৎস বনানীর রমরমা মাদক ব্যবসা। যেসব মাদক ব্যবসায়ী তাকে নিয়মিত মাসোহারা দেয়, তারা এলাকায় নির্বিঘ্নে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশের অভিযানের আগাম তথ্য শহীদ মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে পৌঁছে দেন, যাতে তারা সটকে পড়তে পারে। বিনিময়ে সংগৃহীত মাসোহারার বড় একটি অংশ পৌঁছে যায় কিছু অসাধু পুলিশ কর্মকর্তার পকেটে। মাঝেমধ্যে নিজের কর্তৃত্ব জাহির করতে চুনোপুঁটি মাদকসেবীদের পুলিশে ধরিয়ে দিয়ে তিনি ‘ভালো মানুষ’ সাজার নাটক করেন।

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক ব্যবসায়ী আক্ষেপ করে বলেন, “শহীদকে চাঁদা না দিলে এলাকায় ব্যবসা করা অসম্ভব। মাঝেমধ্যেই দোকান থেকে লোক তুলে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে সে।” অপর এক বাসিন্দা জানান, মদ খেয়ে শহীদের মাতলামি আর সাধারণ মানুষকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা এখন নিয়মিত ঘটনা। তার অত্যাচারে বনানীর সাধারণ মানুষ এখন দিশেহারা।

 

এই বিষয়ে বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ ফরিদুল ইসলাম এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “পুলিশের নাম ভাঙিয়ে বা সোর্স পরিচয় দিয়ে কেউ অপরাধ করলে তাকে ছাড় দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। শহীদের বিষয়ে আমরা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ খতিয়ে দেখছি। অপরাধী যে দলেরই হোক বা যার সোর্সই হোক, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে।”

 

এদিকে বনানী এলাকার বিএনপির স্থানীয় এক নেতা বলেন, “৫ই আগস্টের পর কিছু সুবিধাবাদী লোক দলের নাম ভাঙিয়ে অপকর্ম করছে। শহীদ আমাদের দলের কোনো পদে নেই। তার অপরাধের দায়ভার দল নেবে না। আমরা প্রশাসনের কাছে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।”

 

বনানীর মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় একজন ব্যক্তির এমন বেপরোয়া আচরণ জনমনে চরম নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, অতি দ্রুত এই ‘ছদ্মবেশী’ অপরাধীকে আইনের আওতায় এনে বনানীকে অপরাধমুক্ত করা হোক। অন্যথায় এই অপরাধের বিষবৃক্ষ আরও গভীরে ছড়িয়ে পড়বে, যা নিয়ন্ত্রণ করা ভবিষ্যতে অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।

আপনার মন্তব্য

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

অনুসরন করুন

সর্বশেষ খবর

আর্কাইভ

  • Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
     1234
    567891011
    12131415161718
    19202122232425
    262728293031