ভালোবাসার কোনো রঙ নেই; তিমির বনিক

তিমির বনিক

ভালোবাসার জন্য ঘর হারিয়েছেন দু’জনই। একজনকে সবাই ডাকতো ‘পাগলী’, আরেকজন জন্মান্ধ। তবু হাত ছাড়েননি কেউ কারও। প্রায় ২৫ বছর ধরে সংগ্রাম আর ভালোবাসার গল্প লিখে চলেছেন বাসমতি রবিদাস ও তাঁর স্বামী রামনারায়ণ রবিদাস।

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার পালকিছড়া চা বাগানে ছোট্ট এক টিনের ঘরে তাদের বসবাস। পরিবার ও সমাজের বিরোধিতায় দু’জনকেই ঘরছাড়া হতে হয়। কাজ না পেয়ে বাজারে ছাপরি তুলে শুরু হয় তাদের নতুন জীবন-ভিক্ষাই ছিল একমাত্র উপায় উপার্জনের পথ।

ভোরে উঠে স্বামীর সব কাজ করে দেন বাসমতি। জন্মান্ধ স্বামীকে স্নান করানো থেকে শুরু করে পোশাক পরানো-সব দায়িত্ব তাঁর কাঁধে। এরপর হাত ধরে দু’জনে বের হন জীবিকার সন্ধানে।

রামনারায়ণের প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তিনি একা হয়ে পড়েন। সেই সময় চা বাগানের সবুজ মেঠো পথে পরিচয় বাসমতির সঙ্গে, সেখান থেকেই জন্ম নেয় ভালোবাসা। সম্পর্কের কথা জানাজানি হলে দুই পরিবারই তাদের ত্যাগ করে। কয়েক মাস গাছতলায় থেকেও হাল ছাড়েননি তারা।

 

দুঃখের মাঝেও দুই সন্তানের জন্ম তাদের জীবনে এনে দেয় নতুন আশা। সন্তানদের নিয়ে ভিক্ষা করতে গেলে অনেক সময় স্থানীয় মানুষের সহায়তায় দিন কেটেছে।

সম্প্রতি ভিক্ষার জীবন ছাড়তে এক লাখ টাকা ঋণ নিয়ে অটোরিকশা কিনেছিলেন তারা। আশা ছিল ছেলে চালাবে, সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরবে। কিন্তু মাত্র ছয় মাসের মাথায় গত ৩১শে ডিসেম্বর রাতে চুরি হয়ে যায় সেই উপার্জনের একমাত্র অটোরিকশাটি।

কাঁদতে কাঁদতে রামনারায়ণ বলেন, ‘ভাবছিলাম আর ভিক্ষা করতে হবে না, কিন্তু শেষ ভরসাটাও চলে গেল।’ পাশেই দাঁড়িয়ে বাসমতির কণ্ঠেও হতাশা-‘এই গাড়িটাই আছিল আমাদের বাঁচার আশা।’

প্রতিবেশীরা বলেন, এত অপমান আর অভাবের মধ্যেও শুধু ভালোবাসার জোরেই টিকে আছে এই সংসার। বাসমতির নিষ্ঠা আর দায়িত্ববোধ দেখে অনেকেই বিস্মিত।

সব হারিয়েও তারা আজও পাশাপাশি হাঁটেন- একজনের চোখ আরেকজন, একজনের ভরসা আরেকজন। ভালোবাসার এই গল্পই এখন স্থানীয় মানুষের কাছে আলোচিত এক মানবিক উদাহরণ। বেঁচে থাকুক ভালোবাসা আর ভালোবাসার মানুষগুলো।

আপনার মন্তব্য

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

অনুসরন করুন

সর্বশেষ খবর

আর্কাইভ

  • Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
     1234
    567891011
    12131415161718
    19202122232425
    262728293031