দেশে শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ হঠাৎ উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদানের ঘাটতি, অপুষ্টি, কৃমিনাশক ওষুধ না খাওয়া এবং ভাইরাসের সম্ভাব্য রূপান্তর—এসব কারণ মিলেই পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, হাম টিকার প্রথম ডোজ ৯ মাস বয়সে দেওয়ার নিয়ম থাকলেও বর্তমানে আক্রান্ত শিশুদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের বয়স ৯ মাসেরও কম, যা বিশেষজ্ঞদের নতুন করে ভাবাচ্ছে।
করোনা মহামারি ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দীর্ঘদিন বিশেষ হাম নির্মূল ক্যাম্পেইন না হওয়ায় বহু শিশু টিকার সুরক্ষার বাইরে রয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকার কার্যকারিতা এবং ভাইরাসের ধরণে পরিবর্তনের বিষয়েও তদন্ত জরুরি। পাশাপাশি বুকের দুধ কম খাওয়ানো ও অপুষ্টির কারণে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হওয়ায় ছোট শিশুদের সংক্রমণ দ্রুত জটিল আকার ধারণ করছে।
রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা এবং কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে হামের বিস্তার সবচেয়ে বেশি। ময়মনসিংহে আরও দুই শিশুর মৃত্যুসহ মার্চ মাস জুড়ে সারাদেশে কমপক্ষে ২০টি শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। বিভিন্ন হাসপাতালে হাম সন্দেহে ভর্তির চাপ বাড়ছে, কিন্তু আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর সুবিধার ঘাটতিতে চিকিৎসা কঠিন হয়ে পড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে সরকার নতুন করে ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে হামের টিকা আনার উদ্যোগ নিয়েছে। রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালসহ বড় দশটি মেডিকেল কলেজে আলাদা ওয়ার্ড ও বিশেষ আইসিইউ চালু করা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জুলাই-অগাস্টের মধ্যে বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন চালানোর প্রস্তুতি চলছে। ইতোমধ্যে টিকার চালান আসতে শুরু করেছে এবং গ্যাভি মে-জুলাইয়ে প্রায় ২ কোটি সিরিঞ্জ সরবরাহ করবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও শিশু চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ—টিকা অনিয়মিত হওয়া, পুষ্টিহীনতা, বুকের দুধ না খাওয়ানো এবং কৃমিনাশক ওষুধের অভাব এই প্রাদুর্ভাবের অন্যতম কারণ। পাশাপাশি টিকার মান ও ভাইরাসের রূপান্তর নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। চিকিৎসকদের মতে, তীব্র জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া বা র্যাশ দেখা গেলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। যেহেতু ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যেই সংক্রমণ বেশি, তাই টিকার বয়সসীমা কমানোর বিষয়টিও ভাবছেন বিশেষজ্ঞরা।
শিশু বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন হাম আক্রান্ত শিশু থেকে অন্তত ১৮ জন সংক্রমিত হতে পারে। রোগটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে এবং এতে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও পুষ্টিহীনতার ঝুঁকি বাড়ে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আক্রান্ত শিশুকে আলাদা ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসা দিতে হয়। চিকিৎসকরা একমত—সময়মতো টিকা নিলেই এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, গত আট বছরে কোনো সরকার হাম টিকার বিশেষ ক্যাম্পেইন চালায়নি বলেই এই সংকট তৈরি হয়েছে। তবে বর্তমানে সরকারের সক্ষমতা আছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে আইসিইউসহ বিশেষ কর্নার চালু করা হয়েছে, ডিএনসিসি হাসপাতালেও আলাদা ব্যবস্থা করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, সারা দেশেই কমবেশি সংক্রমণ বাড়ছে, তাই বড় হাসপাতালগুলোতে আলাদা ওয়ার্ড চালুর পাশাপাশি বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি দ্রুত শুরু করার চেষ্টা চলছে।











