ফেসবুকের একটি পোস্ট এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক পাকিস্তানি শিক্ষার্থীর উদ্যোগে দীর্ঘ ৫৪ বছর পর নিজের শিকড় ও বহুদিনের বিচ্ছিন্ন পরিবারকে খুঁজে পেয়েছেন পাকিস্তানি তরুণ সিদ্দিক খান, যিনি ওমর সাদিক নামেও পরিচিত (২৮)।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় হারিয়ে যাওয়া মৌলভীবাজারের আলফু মিয়ার ছেলে সিদ্দিক এখন কুলাউড়ার পূর্বপুরুষের ভিটায় স্বজনদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন। অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর হারানো সদস্যকে ফিরে পেয়ে পরিবারজুড়ে বইছে আনন্দের জোয়ার।
পরিবারের সদস্যদের বরাতে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধের সময় আলফু মিয়ার বয়স ছিল মাত্র ১৪ বছর। তখন তিনি কাউকে কিছু না জানিয়ে এক পাকিস্তানি নাগরিকের সঙ্গে পাকিস্তানে চলে যান। এরপর বহু খোঁজাখুঁজি করেও পরিবারের লোকজন তাঁর কোনো সন্ধান পাননি। পাকিস্তানেই কেটে যায় তাঁর শৈশব ও কৈশোর, এবং সেখানেই পারভিন নামের এক পাকিস্তানি নারীকে বিয়ে করে সংসার শুরু করেন।
দীর্ঘদিন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার পর ২০০০ সালে স্ত্রীর অনুরোধে আলফু মিয়া দুই বছরের ছেলে সিদ্দিককে নিয়ে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে নিজ বাড়িতে আসেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেশে আসার মাত্র তিন দিনের মাথায় তাঁর স্ত্রী পারভিন মারা যান। বাধ্য হয়ে স্ত্রীর মরদেহ নিয়ে আবার পাকিস্তানে ফিরে যেতে হয় তাঁকে। এরপর থেকে পরিবারের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। পরে ২০০৬ সালে পাকিস্তানেই এক সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়।
আলফু মিয়ার বড় ভাই মখলিছুর রহমানের জামাতা নিজাম উদ্দিন খান জানান, দীর্ঘদিন কোনো খোঁজ না পেয়ে কয়েক মাস আগে তিনি ‘বঙ্গ ভিটা’ নামের একটি ফেসবুক পেজে আলফু মিয়ার সন্ধান চেয়ে একটি পোস্ট দেন। পোস্টটিতে ২০০০ সালে বাংলাদেশ সফরের সময় তোলা কয়েকটি ছবিও সংযুক্ত করা হয়।
নিজাম উদ্দিন বলেন, পোস্টটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত পাকিস্তানি শিক্ষার্থী মুছাম্মাদ তাহির ওয়াহিদের নজরে আসে। পরে তিনি পাকিস্তান হাইকমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেন এবং তাদের সহায়তায় আলফু মিয়ার ঠিকানা শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
সেখানে যোগাযোগ করে জানা যায়, আলফু মিয়া আর জীবিত নেই, তবে তাঁর ছেলে সিদ্দিক খান পাকিস্তানেই আছেন। এরপরই বাংলাদেশের পরিবারের সঙ্গে সিদ্দিকের যোগাযোগ স্থাপিত হয়।
নিজের শিকড়ের টানে এবং বাবার স্মৃতিকে কাছে পেতে অবশেষে ২৮ বছর বয়সী সিদ্দিক বাংলাদেশে আসেন। বর্তমানে তিনি মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের গাজীপুর চা-বাগান এলাকায় আত্মীয়দের বাড়িতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এবং পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন।
উল্লেখ্য, সিদ্দিকের দাদা আত্তর মিয়া গাজীপুর চা-বাগানে গাড়িচালক হিসেবে কাজ করতেন। তিনি ২০০৩ সালে মারা যান এবং দাদি আবজান বিবি ২০০৫ সালে ইন্তেকাল করেন। আলফু মিয়া ছিলেন তিন ভাইয়ের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ।
যাকে কখনো সামনে থেকে দেখার আশা ছিল না, সেই আপনজনকে ফিরে পেয়ে আবেগে ভেসে যাচ্ছেন স্বজনেরা। অন্যদিকে সিদ্দিকও তাঁর বাবার জন্মভিটায় এসে খুঁজে পেয়েছেন এক ধরনের মানসিক শান্তি। তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে দুই দেশের দূরত্ব কমে গিয়ে আবার একত্র হয়েছে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া একটি পরিবার।











