যুক্তরাজ্যের জনপ্রিয় পারিবারিক ইতালিয়ান রেস্তোরাঁ চেইন ‘স্প্যাগেটি হাউস’ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় (অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) যাওয়ার পর তাদের সব শাখা তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। প্রায় সাত দশক ধরে পরিচালিত এই রেস্তোরাঁ ব্র্যান্ডটির বন্ধ হয়ে যাওয়ায় লন্ডনের খাদ্যপ্রেমীদের মধ্যে নস্টালজিয়া ও হতাশা ছড়িয়ে পড়েছে।
১৯৫৫ সালে ইতালীয় উদ্যোক্তা সিমোনে লাভারিনি ও তার বন্ধু লরেঞ্জো ফ্রাকুয়েলি লন্ডনের ফিটজরোভিয়া এলাকার গুডজ স্ট্রিটে প্রথম ‘স্প্যাগেটি হাউস’ চালু করেন। সময়ের সঙ্গে এটি লন্ডনের অন্যতম পরিচিত ইতালিয়ান রেস্তোরাঁ চেইনে পরিণত হয়।
চেইনটির মূল প্রতিষ্ঠান ‘লাভাল রেস্টুরেন্টস লিমিটেড’-এর প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছে বিটিজি বেগবিজ ট্রেইনার। গত মাসেই প্রতিষ্ঠানটি প্রশাসক নিয়োগের ইচ্ছা প্রকাশ করে নোটিশ জমা দিয়েছিল।
রেস্তোরাঁটির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বার্তায় বলা হয়েছে,
“আমাদের সব রেস্তোরাঁ এখন বন্ধ। বছরের পর বছর ধরে পাশে থাকার জন্য আমাদের বিশ্বস্ত গ্রাহক, অংশীদার ও বর্তমান-সাবেক কর্মীদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আমাদের পরিবারের পক্ষ থেকে আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ।”
বর্তমানে ব্যবসাটি পরিচালনা করছিলেন প্রতিষ্ঠাতার ছেলে লুইজি লাভারিনি। তার বাবা সিমোনে লাভারিনি ২০২৩ সালে মারা যান। পরিবারের অন্য সদস্য স্টেফানা ও রিকার্দোও ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
ডেইলি মেইলকে দেওয়া এক বিবৃতিতে লুইজি বলেন,
“৭০ বছর ধরে গ্রাহকদের সেবা দেওয়ার পর অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে আমাদের ব্যবসা বন্ধের ঘোষণা দিতে হচ্ছে। মহামারি, ব্রেক্সিট, সরকারি বাজেট ও বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার কারণে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আতিথেয়তা খাত কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়ে।”
তিনি আরও বলেন,
“সব ধরনের চেষ্টা ও পেশাদার পরামর্শ নেওয়ার পরও ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।”
একসময় স্প্যাগেটি হাউসের লন্ডনে ১০টি শাখা ছিল। এর মধ্যে গুডজ স্ট্রিটের মূল শাখা ছাড়াও আর্গাইল স্ট্রিট, মার্বেল আর্চ, অক্সফোর্ড স্ট্রিট, হলবর্ন, কেনসিংটন এবং ওয়েস্টফিল্ড শেফার্ডস বুশে শাখা ছিল। গত দুই বছরে কয়েকটি শাখা বন্ধ হয়ে যায়। সর্বশেষ আর্গাইল স্ট্রিট, কেনসিংটন, ক্র্যানবোর্ন স্ট্রিট, মার্বেল আর্চ ও কার্নাবি স্ট্রিটের পাঁচটি শাখাও বন্ধ হয়ে গেছে।
ইতালীয় ট্রাটোরিয়া ধাঁচে দুই বছর আগে আর্লস কোর্টে চালু হওয়া তাদের নতুন ব্র্যান্ড ‘আ ব্রাচ্চেত্তো’ও বন্ধ হয়ে গেছে।
২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটিতে ২০৪ জন কর্মী ছিলেন। সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদনে প্রায় ১২ লাখ পাউন্ড লোকসানের তথ্য উঠে আসে, যা আগের বছরের তুলনায় আরও ৩ লাখ পাউন্ড বেশি।
প্রতিষ্ঠানটি আগেই জানিয়েছিল, কোভিড-পরবর্তী সময়ে গ্রাহক সংখ্যা আগের অবস্থায় না ফেরা, মুদ্রাস্ফীতি এবং কর্মীদের বেতন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে তারা বড় ধরনের আর্থিক চাপে ছিল।
প্রশাসক প্রতিষ্ঠান বিটিজির প্রতিনিধি অ্যাশার মিলার বলেন,
“বর্ধিত পরিচালন ব্যয়, কর্মসংস্থান খরচ, জ্বালানি ও করের চাপ পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তোলে। পরিচালকদের সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি বন্ধের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।”
স্প্যাগেটি হাউস মূলত বিভিন্ন ধরনের স্প্যাগেটি খাবারের জন্য পরিচিত ছিল। তাদের মেন্যুতে ছিল বোলোনিজ, পোমোদোরো, পেস্টো ও কার্বোনারা সসের স্প্যাগেটি। এছাড়া লিঙ্গুইনি, পেন্নে ও পিজ্জাও পরিবেশন করা হতো।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই রেস্তোরাঁটির বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শোক প্রকাশ করেছেন। একজন লিখেছেন,
“এক প্রজন্মের লন্ডনবাসীর জন্য এটি সত্যিই এক যুগের অবসান।”
রেস্তোরাঁ সমালোচক টম পার্কার বোলস ২০২৪ সালে বলেছিলেন,
“লন্ডনের সেরা ইতালিয়ান রেস্তোরাঁ না হলেও, তাদের দীর্ঘস্থায়িত্ব অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার।”
উল্লেখ্য, ১৯৭৫ সালে ‘স্প্যাগেটি হাউস’ একটি আলোচিত জিম্মি সংকটের ঘটনাতেও খবরের শিরোনাম হয়েছিল। ‘স্প্যাগেটি হাউস সিজ’ নামে পরিচিত ওই ঘটনায় তিন সশস্ত্র ব্যক্তি কর্মীদের জিম্মি করে ছয় দিন ধরে পুলিশের সঙ্গে অবস্থান নেয়। পরে তারা আত্মসমর্পণ করে এবং আদালতে দণ্ডিত হয়।
সুত্র: ডেইলি মেইল











