রাজধানীর ব্যস্ততম মহাখালী টিবি গেইট এলাকা। একদিকে জাতীয় বক্ষব্যাধি ও ক্যান্সার হাসপাতালসহ গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান, অন্যদিকে হাজার হাজার পথচারীর যোগাযোগের মূল পথ। কিন্তু বর্তমানে এই পুরো এলাকাটি পরিণত হয়েছে চরম বিশৃঙ্খলা ও দুর্ভোগের স্থানে। ক্যান্সার হাসপাতাল রোড ও মহাখালী কমিউনিটি সেন্টারের সামনের রাস্তা ও ফুটপাত দখল করে অবৈধ দোকানপাটের কারণে সৃষ্টি হয়েছে ঘিঞ্জি পরিবেশ। ফুটপাত পার হয়ে চলাফেরা করাই এখন যেন সাধারণ পথচারীদের জন্য এক দুর্গম লড়াই। আর এই অবৈধ দখলের নেপথ্যে উঠে এসেছে বনানী থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক চাঁন মিয়া সরদারের নাম।
স্থানীয় অধিবাসীদের অভিযোগ, ডিএনসিসির (ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন) উচ্ছেদ অভিযানকেও তোয়াক্কা করছেন না এই নেতা। তাঁর নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবে এলাকাটিতে একচ্ছত্র চাঁদাবাজির সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছে।
এলাকাবাসী জানান, ফুটপাত দখলমুক্ত করতে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন কিছুদিন পর পরই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে। কিন্তু অভিযান শেষ হতে না হতেই পরিস্থিতি আবার পূর্বের জায়গায় ফিরে যায়। সকালে ম্যাজিস্ট্রেট কিংবা সিটি কর্পোরেশনের টিম দোকানপাট ভেঙে দিয়ে গেলে, চাঁন মিয়ার মদদে বিকালেই ফুটপাতে আবার সারি সারি অবৈধ দোকান বসানো হয়।
শুধু ফুটপাত বা ভাসমান দোকানই নয়, অত্র এলাকার যেকোনো স্থায়ী ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালনা করতে হলেও চাঁন মিয়াকে নির্দিষ্ট অংকের চাঁদা দিতে হয় বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ব্যবসায়ী জানিয়েছেন।
গত ৫ই আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সুযোগ নিয়ে চাঁন মিয়া সরদার মহাখালী কমিউনিটি সেন্টারটিরও সম্পূর্ণ দখল নিয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। বর্তমানে এই সরকারি কমিউনিটি সেন্টার থেকে নিয়মিত লভ্যাংশ বা ‘ভাতা’ তোলেন তিনি। তাছাড়া তাঁর ব্যক্তিগত, দলীয় ও রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ, সেমিনার কিংবা যেকোনো অনুষ্ঠান মহাখালী কমিউনিটি সেন্টারে বিনা খরচে আয়োজন করা হয়।
সম্প্রতি টিবি গেইট এলাকায় চাঁন মিয়ার একটি খাবার বিতরণ কর্মসূচির ঘটনা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রাস্তার মোড়ে একজন দুস্থ মানুষকে খাবারের প্যাকেট দেওয়ার সময় অন্তত দশজন লোক একযোগে মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণে ব্যস্ত ছিলেন।
জানা গেছে, টানা ১৬ বছরের বেশি সময় ধরে চাঁন মিয়া সরদার বনানী থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক। নতুন কমিটি ঘোষণা হয়নি ফলে অন্যান্য নেতৃবৃন্দরাও ১৬ বছরের বেশি সময় ধরে একই পদে বহাল। এনিয়ে তরুণ নেতাদের ক্ষোভ রয়েছে। তাঁরা নতুন কমিটি ঘোষণার দাবি জানান।
এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে টিবি গেইটের এক ব্যবসায়ী বলেন, “একদিন খেয়াল করলাম তিনি টিবি গেইট মোড়ে মূল রাস্তায় পথচারীদের খাবারের প্যাকেট বিতরণ করছেন। সেসময় তার বেশ কয়েকজন লোক মোবাইল দিয়ে ভিডিও ধারণ করায় ব্যস্ত। একজন পথচারীকে খাবারের প্যাকেট দেওয়ার সময় অন্তত ১০ জন ব্যক্তি মোবাইলে সেই দৃশ্য ভিডিও করছে। এতে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে যে তিনি মূলত প্রচারের উদ্দেশ্যেই খাবার বিতরণ করছেন। এই ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার পর যিনি খাবার নিলেন, সামাজিকভাবে তাঁর সম্মানহানি হয়েছে বলে আমরা মনে করি।”
জানা গেছে, চাঁন মিয়া সরদার আসন্ন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ২০নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদপ্রার্থী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে তাঁর এ ধরনের কর্মকাণ্ড নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বড় ধরনের সংশয় ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক বয়োজ্যেষ্ঠ অধিবাসী মন্তব্য করেন, “তিনি রাজনৈতিক দল ও প্রভাবশালী পদের সুবিধা নিয়েও নিজের এলাকার পরিবেশ সুন্দর রাখতে পারছেন না। ফুটপাত দখল আর চাঁদাবাজি যাদের মূল ভিত্তি, তিনি কাউন্সিলর হলে সাধারণ মানুষের সুবিধা-অসুবিধার বিষয়ে কতটুকু খেয়াল করবেন তা নিয়ে আমাদের যথেষ্ট সন্দেহ ও ভয় রয়েছে।”
এসব অভিযোগের বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করে বনানী থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক চাঁন মিয়া সরদার বলেন, “আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হচ্ছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের চক্রান্ত। আমি কোনো চাঁদাবাজি বা ফুটপাত দখলের সাথে জড়িত নই। কমিউনিটি সেন্টার দখল করার প্রশ্নই ওঠে না, আমরা কেবল সামাজিকভাবে তা তদারকি করি। আর ত্রাণ বা খাবার বিতরণের বিষয়টি আমাদের দলের নিয়মিত মানবিক কর্মসূচির অংশ, কাউকে সামাজিকভাবে হেয় করার কোনো উদ্দেশ্য আমাদের ছিল না।”
পরিচয় গোপন রাখার শর্তে বনানী থানা বিএনপির শীর্ষ দায়িত্বশীল একজন নেতা জানান, “আমাদের দলে কোনো চাঁদাবাজ, দখলদার বা গণবিরোধী কর্মকাণ্ডের স্থান নেই। বনানী থানার সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে যদি চাঁদাবাজি বা সরকারি সম্পদ দখলের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে সংগঠনের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা্র অনুরোধ জানাই।”
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মারুফা বেগম নেলী জানান, “টিবি গেইট এলাকার ফুটপাত অবৈধ দখলমুক্ত করতে আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করি। কেউ যদি আবার অবৈধভাবে বসায় বা চাঁদা তোলে, তবে তা আইনবিরোধী। শিগগিরই সেখানে বড় ধরনের যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হবে।”
বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ ফরিদুল ইসলাম জানান, “চাঁদাবাজি ও অবৈধ দখলের বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আমরা কাউকেই ছাড় দেব না। আইন সবার জন্য সমান।”
ক্যান্সার হাসপাতালের মতো স্পর্শকাতর এলাকার আশপাশের পথচারী ও রোগীদের ভোগান্তি দূর করতে ফুটপাত স্থায়ীভাবে দখলমুক্ত করা এবং এসব চাঁদাবাজির লাগাম টানতে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করছেন টিবি গেইটবাসী।











