আবু নাসের তানজীম: ২০২৫ সালের মার্চ-এপ্রিলে বাংলাদেশে ঘটতে থাকা কিছু ঘটনাকে এককভাবে দেখলে সেগুলো হয়তো সাধারণ কূটনৈতিক সফর বা বৈদেশিক সহায়তার প্রয়াস হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু যদি এসব ঘটনাকে একটি লম্বা সময়সীমার মধ্যে যুক্ত করে বিচার করা হয়, তাহলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে-এটি নিছক কাকতালীয় নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত চক্রান্ত যার শেষ গন্তব্য হতে পারে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা।
এই লেখায় আমি বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করব, কীভাবে “মানবিক করিডোর” নামক একটি কথিত সহানুভূতির মুখোশ পরে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ছে একটি বৃহৎ সামরিক ভূ-রাজনৈতিক খেলা, যার পরিণতি শুধু দেশের সার্বভৌমত্ব নয়, বরং গোটা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোকে নাড়িয়ে দিতে পারে।শুরুটা ‘মানবিকতা’ দিয়ে: জাতিসংঘের কথিত করিডোর পরিকল্পনা ১৪ মার্চ ২০২৫ তারিখে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ইফতার করতে এসে হঠাৎ করে ‘মানবিক করিডোর’ তৈরির প্রস্তাব দেন। উদ্দেশ্য দেখানো হয় রাখাইন রাজ্যে যুদ্ধপীড়িত জনগণের জন্য বাংলাদেশ থেকে সহায়তা পৌঁছে দেওয়া। আন্তর্জাতিক মহলের সামনে এটি একটি সহানুভূতিশীল, মানবিক উদ্যোগ হিসেবে উপস্থাপিত হলেও, এর আড়ালে যে সামরিক উদ্দেশ্য লুকিয়ে ছিল, তা অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই প্রকাশ পেতে থাকে।প্যাসিফিক আর্মি ও বিদ্রোহীদের সরাসরি সহায়তার ছক২৪ মার্চ বাংলাদেশ সফরে আসেন মার্কিন প্যাসিফিক আর্মির ডেপুটি কমান্ডিং জেনারেল লে. জেনারেল জোয়েল বি. ভাওয়েল। তিনি জানিয়ে দেন, আরাকান আর্মি রাখাইনের তিন শহর-সিউতি, মারাউং ও কিয়াকফিউতে বড় ধরনের সামরিক অভিযানে যাচ্ছে এবং তাদের প্রয়োজন প্রশিক্ষণ, অস্ত্র ও খাদ্য-যা বাংলাদেশ ভূখণ্ডের ভেতর দিয়েই সরবরাহ করতে হবে। এর অর্থ দাঁড়ায়, বাংলাদেশ ব্যবহৃত হবে একটি মার্কিন-সমর্থিত বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সরবরাহ রুট হিসেবে।এত বড় পরিকল্পনার মধ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কী ভূমিকা রাখছে? এ প্রশ্নের উত্তর আরও রহস্যময় হয়ে ওঠে যখন দেখা যায়, সেনাপ্রধান ৬ এপ্রিল রাশিয়া সফরে যান এবং তার অনুপস্থিতিতে ৯ এপ্রিল হঠাৎ করে খলিলুর রহমান নামের একজন মার্কিনপন্থী নাগরিককে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। তিনি সরাসরি নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে শুরু করেন-যা স্পষ্টতই সেনাবাহিনীকে পাশ কাটিয়ে, বিদেশি স্বার্থের প্রতিনিধিকে ক্ষমতার কেন্দ্রে আনার ইঙ্গিত।একদিকে রাশিয়ার প্রতিক্রিয়া, অন্যদিকে মার্কিন কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপ১৪ এপ্রিল রাশিয়ার তিনটি যুদ্ধজাহাজ পরমাণু সাবমেরিনসহ চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়ে। এটি ছিল একটি কৌশলগত বার্তা-বাংলাদেশ যদি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি গড়ার পথে এগোয়, তবে রাশিয়া চুপ করে থাকবে না।এরপর ১৭ এপ্রিল আসে আরও বড় ঘটনা। ঢাকা সফর করেন যুক্তরাষ্ট্রের উপসহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিকোল এ. চুলিক, প্যাসিফিক অঞ্চল বিষয়ক উপসহকারী অ্যান্ড্রু হেরাপ, এবং মিয়ানমারে মার্কিন দূত সুসান স্টিভেনসন। তারা বাংলাদেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান ও ‘শাসক ইউনুস’ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সাথে সাক্ষাৎ করে করিডোর পরিকল্পনায় চূড়ান্ত অনুমোদন পায়।এই সফরেই ঢাকায় বসে বৈঠক হয় বার্মার বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি এবং চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (CNF)-এর প্রতিনিধিদের সাথে। সেই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, বৌদ্ধ উগ্রবাদী সংগঠনগুলো রোহিঙ্গা মুসলমানদের এই অভিযানে নিতে অস্বীকৃতি জানাবে, এবং কেবল নির্দিষ্ট ‘জাতীয়তাবাদী’ লাইন অনুসরণ করেই অভিযান পরিচালিত হবে। প্রশ্ন হচ্ছে—এই জঙ্গি পরিকল্পনা ও বৈঠক বাংলাদেশের মাটিতে কে অনুমতি দিল?ইউনুস সরকার কী বিকিয়ে দিচ্ছে বাংলাদেশকে?২৭ এপ্রিল সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে তারা রাখাইনের জন্য করিডোর দিতে ‘নীতিগতভাবে’ সম্মত। এর একদিন পর, ২৮ এপ্রিল, বাংলাদেশে স্টারলিংক ইন্টারনেট সেবা অনুমোদন পায়, যা মার্কিন সামরিক যোগাযোগ ব্যবস্থার একটি অঙ্গ। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রযুক্তি যেন সহজে ও দ্রুততার সাথে বাংলাদেশে কাজ করতে পারে—এমন ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়।অন্যদিকে, এই পুরো প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের জনগণ কিছুই জানে না, গণমাধ্যমে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে নীরবতা, আর সংসদেও নেই কোনো প্রশ্নোত্তর পর্ব।এই করিডোর কি যুদ্ধের আগমনবার্তা?এই কথিত মানবিক করিডোর ভবিষ্যতে যে আরও বিপজ্জনক রূপ নিতে পারে, তা বোঝার জন্য কূটনৈতিক চশমার প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশের ভেতরে যদি একটি মার্কিন সামরিক সরবরাহ ঘাঁটি তৈরি হয় এবং সেই ঘাঁটি থেকে অন্য দেশের বিদ্রোহীদের অস্ত্র ও রসদ সরবরাহ করা হয়, তাহলে বাংলাদেশ নিজেই একপ্রকার যুদ্ধের সহায়ক শক্তি হয়ে দাঁড়াবে।আর যদি চীন, রাশিয়া বা ভারত এই পদক্ষেপকে তাদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখে, তবে বাংলাদেশের ওপর তাদের প্রতিক্রিয়া কী হবে? আমরা কি পরিণত হতে যাচ্ছি দক্ষিণ এশিয়ার ইউক্রেনে?সমাপ্তি: এখনই প্রশ্ন তুলতে হবেবাংলাদেশের জনগণকে এখনই সচেতন হতে হবে-এই করিডোর কাদের জন্য, কাদের স্বার্থে? আমাদের মাটি কি অন্য দেশের যুদ্ধের জন্য ব্যবহৃত হবে? আমাদের সরকার কি প্রকৃত অর্থেই জনগণের সরকার, নাকি একটি ভাড়াটে ব্যবস্থাপনা যাদের কর্তৃত্ব চলে গেছে আন্তর্জাতিক শক্তির হাতে?রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব শুধু জাতীয় সংগীত গাওয়ার বিষয় নয়; এটি প্রতিদিনের বাস্তব সিদ্ধান্তে প্রমাণ করতে হয়। ইউনুস সরকার কি সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হচ্ছে, নাকি গোপনে দেশকে বিকিয়ে দিচ্ছে?
আবু নাসের তানজীম











