সাজন আহমেদ:
সুখে থাকতে ভূতে কিলায় বলে বাংলায় একটা প্রবাদ আছে। এটি একটি চমকপ্রদ বাক্য। মানুষের আকাঙ্ক্ষা হলো সুখ। সেই সুখ যে পেয়ে যায়, সে বিগড়ে যাবে! তাই কি সম্ভব? না তা হয় কখনও? সবার আগে আমাদের জানা দরকার, সুখ জিনিসটা কী? সুখ আসলে কী তা নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। অনেকে মনে করেন চাহিদা তত্ত্বের শিখরে পৌঁছলেই সুখ খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ আব্রাহাম মাসলো এই তত্ত্বকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেন এবং পাঁচ স্তরের চাহিদা তত্ত্বের সূত্র দেন। যেখানে তিনি বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে মানুষের চাহিদা একটা পূরণ হবার সঙ্গে সঙ্গে আর একটি উন্নত চাহিদা তার সামনে এসে হাজির হয়,এরকম চলতেই থাকে যার কোনো সীমা থাকে না । সুতরাং কোনও একটি নির্দিষ্ট চাহিদা পূরণ হলেই সুখের নাগাল পাওয়া গেল তা বলা যাবে না। আপাতদৃষ্টিতে সুখ একটি মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপার। এটা একটা অনুভব, অনুভূতি। কোনো একটি নির্দিষ্ট প্রয়োজনে কতটুকু প্রাপ্তিতে একজন সন্তুষ্ট হবেন তার ওপর সুখ নির্ভর করে। ধরা যাক, একজন ব্যক্তির অর্থনৈতিক সক্ষমতায় তিনি একটি সাইকেল কিনতে পারবেন। কিন্তু তিনি যদি আফসোস করেন, কেন একটি মোটর সাইকেল কিনতে পারলেন না তাহলে তিনি অসুখি। আর যদি কেউ তার যা সামর্থ্য আছে তাতেই তুষ্ট থাকেন অর্থাৎ ওই সাইকেলেই যদি একজন ব্যক্তি মানসিকভাবে তৃপ্ত হতেন তাহলে তিনি সুখ খুঁজে পেতেন।কে কিসে সুখি হন -তা বলা কঠিন। কাজী নজরুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘কেউ হাসি চায়, কেউ ভালবাসা, কেউ চায় মিঠে কথা। কেউ চায় আবার নয়নের জল, কেউ চায় এর ব্যথা’। অর্থাৎ কে কী চায় তা যেমন আমরা বলতে পারি না, কে কীসে সুখি হয় তাও আমরা বলতে পারব না। মানুষের চাওয়াও যেমন বিচিত্র, সুখি হওয়ার উপকরণ বা কারণও তেমনি বিচিত্র।সুখের সংজ্ঞা বুঝুক না বুঝুক, সুখ কী জানুক না-জানুক মানুষ সুখ চায়, সুখি হতে চায়। কিন্তু কেউ সুখি হয় কেউ হয় না। এ নিয়ে মানুষের হাহাকার আছে, অনুশোচনা আছে, আছে আক্ষেপ, দীর্ঘশ্বাস। সুখ সুখ করে আমরা যেমন কেঁদে বেড়াই, আবার অনেক সময় একটু সুখের দেখা পেলেই তা হারাতে ব্যাকুল হয়ে যাই!সুখ কী, সুখে থাকতে কেন ভূতে কিলায় এসব নিয়ে অনেক তর্ক আছে। তারপরও বাস্তবতা হলো, আমাদের মধ্যে অনেকেই আছেন, যাদের সত্যিই সুখে থাকতে ভূতে কিলায়।দেশের বর্তমান পরিস্থিতির কথা চিন্তা করুন। ছাত্রজনতার গণ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আমরা স্বৈরাচারমুক্ত এক নতুন বাংলাদেশ পেয়েছি, গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড, রাহাজানি ও , নৈরাজ্যের একটা দীর্ঘ অসহনীয় কাল পেরিয়ে আমরা মোটামুটি একটা স্থিতিশীল অবস্থায় পৌঁছেছিলাম। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যখন রাষ্ট্রের দুর্নীতিগ্রস্ত ও অকার্যকর প্রতিষ্ঠানগুলো সংস্কারে উদ্যোগ নিয়েছে, তখনই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নির্বাচন ইস্যুতে সরব হয়ে ওঠে। যেকোনো জাতীয় ইস্যু সামনে এলেই বিএনপির তৃণমূল থেকে শীর্ষ পর্যায়ের নেতাকর্মীরা নির্বাচনকে প্রধান সমাধান হিসেবে তুলে ধরেন। তাদের বক্তব্যে বারবার উঠে আসে নির্বাচন ছাড়া রাষ্ট্রীয় সংকটের কোনো সমাধান নেই।তবে আজ যারা নির্বাচন নিয়ে সোচ্চার, ফ্যাসিবাদী শাসনের সময় তাদের অবস্থান ছিল একেবারে ভিন্ন। সে সময় বিএনপির প্রধান বেগম খালেদা জিয়া দুর্নীতির মামলায় ২০১৮ সাল থেকে কারাবন্দি ছিলেন এবং চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত হন। ফ্যাসিবাদ পতনের পর তিনি মুক্তি লাভ করেন।তার অনুপস্থিতিতে দলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তারেক রহমান, যিনি বিগত ১৭ বছর ধরে নির্বাসিত অবস্থায় রয়েছেন। সে সময় তাকেও “পলাতক” হিসেবে চিহ্নিত করা হতো। পাশাপাশি বিএনপির একাধিক শীর্ষস্থানীয় নেতা ছিলেন কারাগারে। অনেকে ছিলেন দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও হত্যার মতো গুরুতর অভিযোগে দণ্ডিত, যদিও কিছু মামলার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।ফ্যাসিবাদ পতনের পর এদের অনেকেই আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মুক্তি পেয়েছেন এবং আবার রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছেন। নিচে এমন কয়েকজন নেতার তথ্য উল্লেখ করা হলো:★লুৎফুজ্জামান বাবরসাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও বিএনপির প্রভাবশালী নেতা। তিনি ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় মৃত্যুদণ্ড, ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলায় মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন এবং দুর্নীতির মামলায় আট বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ছিলেন। দীর্ঘ ১৭ বছর কারাভোগের পর ২০২৫ সালের ১৬ জানুয়ারি তিনি কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান।★আব্দুস সালাম পিন্টুবিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী। তিনিও ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মামলায় গ্রেপ্তার হন এবং ১৭ বছর কারাভোগের পর ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর মুক্তি লাভ করেন। ★জাকির খাননারায়ণগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি। তার বিরুদ্ধে চারটি হত্যা মামলাসহ মোট ৩৩টি মামলা ছিল। দুই দশক পলাতক থাকার পর তিনি আড়াই বছরের কারাভোগ শেষে ২০২৫ সালের ১৩ এপ্রিল মুক্তি পান এবং বর্তমানে পুনরায় রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছেন। তাছাড়া ৫ই আগস্টের পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, হাবিবুন্নবী খান সোহেল,সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, মির্জা আব্বাস,আমান উল্লাহ আমানসহ আরো অনেকেই মুক্তি পেয়েছেন।সারাদেশে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত দায়েরকৃত রাজনৈতিকভাবে হয়রানিমূলক মামলাগুলোর মধ্যে বিএনপি’র লক্ষাধিক মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। সুতরাং, এতদিন বিএনপি যেখানে রাজনৈতিক কর্মসূচী ব্যতিরেকে আদালতে দৌড়াদৌড়ি করে দিনাতিপাত করতো আজ তারা সুখে -শান্তিতে নিরাপদে থাকতে পারছে রাজনৈতিক কর্মসূচিও পালন করতে পারছে। কিন্তু এগুলো তাদের সহ্য হচ্ছে না তাদের নির্বাচন দরকার, দরকার ক্ষমতার,দরকার দখলদারী রাজনীতির যেখানে বাধা দেওয়ার কেউ থাকবে না। এদেরকে আসলেই যেন সুখে থাকতে ভূতে কিলায়।বিএনপিকে গত ৯ মাসে যেসব কর্মকান্ড করেছে তার কারণে অনেকেই বিএনপিকে সুধীজনের সমর্থন পাবে বলেও মনে হয় না। গত ৯ মাসে বিএনপি’র কার্যক্রমের দিকে নজর দিলে শুধু চাঁদাবাজি আর দখলদারি ছাড়া ভালো কিছু দেখতে পাওয়া যায় না। তারাও হয়তো মনে মনে আওয়ামিলীগ হয়ে উঠতে চায়। তাই জনমনে এমন প্রশ্নও উঠছে যে”ক্ষমতায় যাওয়ার আগেই যদি এমন হয় ক্ষমতায় গেলে কি হবে?” বিএনপি নিজেদের ইমেজ আসলে নিজেরাই ধ্বংস করেছে। এ পরিস্থিতিতে বিএনপির নেতানেত্রীদের প্রতি অনুরোধ আপাতত ক্ষান্ত দিন। ইউনুস সরকারকে একটু সময় দিন, হাসিনার রেখে যাওয়া ধ্বংসস্তুপকে পুননির্মাণ করতে সহযোগিতা করুন,প্রতিনিয়ত যে আন্দোলনের ডাক দেন সেই আন্দোলনে যাওয়াটা সুখকর নয়। আপনারা সুখে আছেন,সুখেই থাকুন। শুধু বিএনপি’র নেতাকর্মীরাই নয়, আমরা দেশের নিরীহ মানুষেরাও একটু সুখ চাই, একটু অবসর চাই, একটু সুখে থাকতে চাই। এর মধ্যে কাউকে ভূতে কিলাক তা আমরা দেখতে চাই না।











