নিস্তব্ধ ‘ফিরোজা’: সবই আছে, নেই শুধু খালেদা জিয়া

ষ্টাফ রিপোর্টার

গুলশানের বাসভবন ‘ফিরোজা’ আজ এক গভীর শূন্যতা ও নিস্তব্ধতার আবরণে ঢাকা। বাড়ির চারপাশের বাগান, বসার ঘরের আসবাব, প্রহরীদের ছাউনি—সবকিছু আগের মতোই রয়েছে; কিন্তু নেই বাড়ির প্রিয় মানুষটি, বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। বৃহস্পতিবার সকালে বাসার সামনে গিয়ে চোখে পড়ে শোকাবহ পরিবেশ।

ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ মইনুল রোডের যে বাড়িতে সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি হিসেবে বসবাস করতেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, তাঁর মৃত্যুর পর দীর্ঘ সময় সেটিই ছিল খালেদা জিয়ার একমাত্র ঠিকানা। এক–এগারোর পর শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতায় এলে তিনি সেখান থেকে উচ্ছেদ হন এবং এরপর থেকেই গুলশানের ‘ফিরোজা’ হয়ে ওঠে তাঁর স্থায়ী নিবাস। ২০১৮ সালে এখান থেকেই তাঁকে দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলায় পুরনো ঢাকার কারাগারে যেতে হয়। করোনা মহামারির সময় বিশেষ শর্তে মুক্ত হয়ে তিনিই আবার ফিরেছিলেন এই বাড়িতে।

আজও ফিরোজার প্রবেশমুখে প্রহরীদের নিয়মিত পাহারা দেখা গেলেও সবার চোখেমুখে এখন শুধু বিষণ্নতা। হাতে কালো ব্যাজধারী এক নিরাপত্তাকর্মী অশ্রুসজল কণ্ঠে বলেন, ‘ম্যাডাম সব সময় আমাদের খোঁজ নিতেন। খেয়েছি কি না জিজ্ঞেস করতেন। আজ তিনি নেই… পুরো বাড়িটাই যেন শুনশান।’

বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান বলেন, ‘এই বাড়ির প্রতিটি কোণে বেগম জিয়ার অগণিত স্মৃতি জড়িয়ে আছে। যারা ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে তাঁর সঙ্গে কাজ করেছেন, তাদের শোক ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। বাড়িতে ঢুকলেই মনে হয়—ম্যাডাম যেন এখনো আমাদের মাঝেই আছেন।’

চেয়ারপারসনের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনী (সিএসএফ)-এর এক সদস্য বলেন, ‘দীর্ঘদিন তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেছি। আজ বাড়ির ভেতরে ঢুকলে এক অদ্ভুত শূন্যতা গ্রাস করে। শুধু প্রার্থনা করি, আল্লাহ তাঁকে শান্তিতে রাখুন।’

ফিরোজার পাশের ১৯৬ নম্বর বাড়িটি ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের পরিবারের জন্য বরাদ্দ দিয়েছিল তৎকালীন সরকার। কয়েক মাস আগে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান বাড়িটির দলিলপত্র খালেদা জিয়ার হাতে তুলে দেন। বর্তমানে সেখানেই অবস্থান করছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

মায়ের মৃত্যুতে দিনভর ইবাদত, কোরআন তিলাওয়াত ও দোয়ায় সময় কাটাচ্ছেন তিনি। আত্মীয়স্বজন দেখা করতে আসলে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং মায়ের নানা স্মৃতিচারণ করেন।

কূটনৈতিক এলাকা হওয়ায় সাধারণ মানুষের চলাচল সীমিত থাকলেও এলাকার বাসিন্দারা নীরবে এসে শোক প্রকাশ করছেন। গুলশানের বাসিন্দা হাসানুজ্জামান খান বলেন,
‘ম্যাডাম নেই—এটা শুধু তারেক রহমানের শোক নয়, এটা আমাদের গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষের শোক।’

একইভাবে গুলশানের বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়েও শোকের আবহ বিরাজ করছে। ভবনে কালো পতাকা, দলীয় ও জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে। খোলা শোক বইতে আজ স্বাক্ষর করেছেন সমাজকল্যাণ উপদেষ্টা শারমীন এস মুর্শিদ, যুক্তরাষ্ট্রের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ট্রেসি অ্যান জেকবসন, ইরানের রাষ্ট্রদূত মনসুর চাভুশি, ছারছীনা দরবার শরীফের পীর মাওলানা শাহ আবু নছর নেছার উদ্দিন আহমেদ এবং জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারি।

কার্যালয়ের বাইরে দলীয় নেতাকর্মী ও গণমাধ্যম কর্মীদের উপস্থিতিও ছিল লক্ষণীয়। অনেকে বলেন,
‘ম্যাডামের জনপ্রিয়তার যে রেকর্ড, তা ভাঙা কোনো দিনই সম্ভব হবে না।’

উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার ভোরে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। বুধবার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে জানাজা শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে শেরেবাংলানগরের জিয়া উদ্যানে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে দাফন করা হয়।

আপনার মন্তব্য

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

অনুসরন করুন

সর্বশেষ খবর

আর্কাইভ

  • Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
     1234
    567891011
    12131415161718
    19202122232425
    262728293031