গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি স্বাধীন গণমাধ্যম।জাতীয় নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই দেশের গণমাধ্যমের ভূমিকা প্রশ্নের মুখে পড়ছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে জোরালো অভিযোগ উঠেছে, নির্বাচনী পরিস্থিতি নিজেদের অনুকূলে আনতে বিএনপি প্রত্যেকটি মূলধারার গণমাধ্যমকে ৫ কোটি টাকা করে দিয়েছে। এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন-পূর্ব সময়ে গণমাধ্যমে বিএনপিকে ঘিরে সম্পাদকীয় আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে আসার প্রেক্ষাপটে বিএনপি কর্তৃক দেশের মূলধারার গণমাধ্যমকে প্রভাবিত করতে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ নির্বাচন-পূর্ব সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতাকে বড় এক প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। দলটির অতীত ও বর্তমান সহিংস রাজনীতি, দলীয় প্রভাব খাটিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড, চাঁদাবাজি, অর্থনৈতিক উৎস ও দায়বদ্ধতা নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রায় অদৃশ্য, অথচ তাদের বক্তব্য ও কর্মসূচি প্রচার হচ্ছে প্রশ্নহীনভাবে। একাধিক গণমাধ্যম প্রকাশ্যে ধানের শীষে ভোটও চেয়ে যাচ্ছে।
একই অঙ্ক “৫ কোটি টাকা” বিভিন্ন সূত্রে বারবার উঠে আসায় বিষয়টি কাকতালীয় বলে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রশ্ন উঠছে, এই বিপুল অর্থের উৎস কোথায় এবং কেন নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া ব্যয়ের হিসাবপত্রে এর কোনো প্রতিফলন নেই।
এই বিষয়ে অনুসন্ধানে কথা বলেছেন একাধিক সাংবাদিক, যারা পেশাগত ও নিরাপত্তাজনিত কারণে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক।
আমার কাছের একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক বলেন,
“নির্বাচনের সময় গণমাধ্যমকে প্রভাবিত করার চেষ্টা নতুন নয়, তবে নির্দিষ্ট অঙ্কে অর্থ দেওয়ার অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। আমরা অভ্যন্তরীণভাবেও কিছু অস্বাভাবিক তৎপরতা লক্ষ্য করেছি, যা প্রশ্ন তৈরি করে। অর্থের বিষয়টি যদিও আমাদের কানে এসেছে টাকার পরিমাণই বা কি সেটা জানা নেই, বাস্তবে চোখে দেখিনি,তবে পারিপার্শ্বিক অবস্থার ভিত্তিতে এটাকে ভিত্তিহীন বলেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
আরেকজন সিনিয়র সাংবাদিক জানান,“কিছু গণমাধ্যমে হঠাৎ করে সম্পাদকীয় নীতিতে যে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, তা স্বাভাবিক নয়। অতীতেও আমরা এই পরিবর্তন দেখেছি কিন্তু আজকের পরিস্থিতি আগে কখনো চোখে পড়ে নি। এটি পরিকল্পিত চাপ কিংবা প্রভাবের ফল কি না তা তদন্তের দাবি রাখে। ”
বাংলা ভিশনের সিনিয়র রিপোর্টার কেফায়েত শাকিল বলেন, “খোদ সরকারি সংবাদ সংস্থাই যখন একদিকে ঝুঁকে পড়ে তখন আর কাকে কি বলা যায়। গণমাধ্যম নিজেই যদি নিরপেক্ষতা নষ্ট করে তাহলে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করবে কে?এভাবে সাংবাদিকতা যে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে যেসব রিপোর্টাররা মাঠে যায় তারা বুঝতে পারে। আফসোস ৫ই আগস্ট এত সাংবাদিক জুতাপেটা খাইলো তাও কেউ কিছু শিখলো না। মানুষের গালাগালি শুনে মাঝে মাঝে মনচায় সাংবাদিকতা ছেড়ে দেই।”
এ নিয়ে সাংবাদিক ও সাংবাদিক সংগঠনগুলোর প্রতিক্রিয়া এই অভিযোগকে আরও গুরুত্ব দিয়েছে। কারণ, এটি আর কেবল রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই এটি সাংবাদিক সমাজের ভেতরেও উদ্বেগ ও অস্বস্তি তৈরি করেছে
বিএনপি অভিযোগ অস্বীকার করলেও তারা এখনো কোনো স্বাধীন তদন্তের দাবি জানায়নি কিংবা এর বিপক্ষে কোনো উপযুক্ত যুক্তি তুলে ধরে নি। এই নীরবতাই সন্দেহকে আরও ঘনীভূত করছে।
গণমাধ্যম যদি অর্থের বিনিময়ে নীরব থাকে বা একটি দলের পক্ষে কাজ করে তাহলে ভোটের আগেই গণতন্ত্র পরাজিত হয়।
বিএনপির বিরুদ্ধে ওঠা গণমাধ্যমকে কোটি টাকা দেওয়ার অভিযোগ কোনো সাধারণ অভিযোগ নয়। এটি সত্য হলে প্রমাণ করে দলটি জনসমর্থনের চেয়ে অর্থনৈতিক প্রভাবকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। আর মিথ্যা হলে, বিএনপির উচিত ছিল সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা দেখানো। কিন্তু দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র নথিহীন অস্বীকার, তদন্তে অনীহা এবং প্রশ্নের মুখে নীরবতা। নীরবতা অবশ্যই একটি রাজনৈতিক ভাষা, আর সেই ভাষা খুব কম সময়ই নির্দোষ হয়।











