সংঘাতের আগেই হরমুজ পার হয়ে ১৫ জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার আগে হরমুজ প্রণালি ও ওমান উপসাগর অতিক্রম করে বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা হওয়া ১৫টি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাতে শুরু করেছে। প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার আগেই এসব জাহাজ গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ অতিক্রম করতে সক্ষম হয়।

চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, এসব জাহাজের মধ্যে চারটিতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), দুটিতে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) এবং নয়টিতে সিমেন্টশিল্পের কাঁচামাল ক্লিংকার রয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় সাড়ে সাত লাখ টন পণ্য বহন করছে জাহাজগুলো। এর মধ্যে ১২টি ইতোমধ্যে বন্দরে পৌঁছেছে এবং বাকি তিনটি চলতি সপ্তাহের মধ্যে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা এবং এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ার পর হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করে। তেহরানের অবস্থানের কারণে এই নৌপথে জাহাজ চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, যার ফলে বিশ্বজুড়ে তেল ও এলএনজি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ঝুঁকির মুখে পড়ে।

হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে ইরাক, ইরান, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব—এই সাত দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের পণ্য পরিবহন হয়ে থাকে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে প্রণালির পাশের দেশ ওমান থেকেও ওমান উপসাগরীয় রুটে পরিবহন ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। পারস্য উপসাগর থেকে জাহাজগুলো সাধারণত হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে ওমান উপসাগর, আরব সাগর, ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগর হয়ে বাংলাদেশে পৌঁছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, কাতার থেকে প্রায় ১ লাখ ২৬ হাজার টন এলএনজি নিয়ে ‘আল জোর’ ও ‘আল জাসাসিয়া’ নামের দুটি জাহাজ ইতোমধ্যে বন্দরে পৌঁছেছে। এ ছাড়া ‘সেভান’ নামের একটি এলপিজিবাহী জাহাজ আগামী রোববার বন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। একইভাবে ‘আল গালায়েল’ ও ‘লুসাইল’ নামের আরও দুটি এলএনজিবাহী জাহাজ যথাক্রমে আগামী বুধবার ও সোমবার বন্দরের জলসীমায় পৌঁছাতে পারে। চারটি জাহাজে মোট প্রায় ২ লাখ ৪৭ হাজার টন এলএনজি রয়েছে। কাতারের রাস লাফান বন্দর থেকে সংঘাত শুরুর দুই থেকে সাত দিন আগেই এসব জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছিল।

এলএনজি জাহাজগুলোর স্থানীয় প্রতিনিধি প্রতিষ্ঠান ইউনি গ্লোবাল বিজনেস লিমিটেডের জ্যেষ্ঠ উপমহাব্যবস্থাপক মো. নুরুল আলম জানান, চারটি জাহাজের চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানো প্রায় নিশ্চিত। তবে ‘লিবারেল’ নামে আরেকটি এলএনজিবাহী জাহাজ এখনো হরমুজ প্রণালির ভেতরে অবস্থান করছে। জাহাজটিতে এলএনজি বোঝাই করা হয়েছে এবং এটি প্রণালি অতিক্রমের অপেক্ষায় রয়েছে। ভবিষ্যৎ চালান নিয়ে আপাতত অনিশ্চয়তা রয়েছে বলেও তিনি জানান।

সম্ভাব্য সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় সরকার খোলাবাজার থেকেও বেশি দামে দুটি এলএনজি জাহাজ কিনেছে, যদিও সেগুলো এখনো বন্দরে পৌঁছায়নি।

তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস নিয়ে ‘সেভান’ নামের একটি জাহাজ রোববার চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এতে রয়েছে ২২ হাজার ১৭২ টন এলপিজি, যা ওমানের সোহার বন্দর থেকে আনা হচ্ছে। এর আগে একই বন্দর থেকে ‘জি ওয়াইএমএম’ নামের আরেকটি এলপিজিবাহী জাহাজ যুদ্ধ শুরুর আগেই বন্দরে পৌঁছায়, যাতে ছিল ১৯ হাজার ৩১৬ টন এলপিজি। দুটি জাহাজে মোট প্রায় ৩৫ হাজার টন এলপিজি রয়েছে, যা মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের সহযোগী প্রতিষ্ঠান মেঘনা ফ্রেশ এলপিজির জন্য আনা হয়েছে।

এ ছাড়া কুয়েতের শুয়াইবা বন্দর থেকে পাঁচ হাজার টন মনোইথিলিন গ্লাইকোল (এমইজি) নিয়ে ‘বে ইয়াসু’ নামের একটি জাহাজ গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে।

সিমেন্টশিল্পের কাঁচামাল ক্লিংকার, জিপসাম, চুনাপাথর ও পাথর নিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আরও কয়েকটি জাহাজ বন্দরে এসেছে। এসব জাহাজে মোট প্রায় ৫ লাখ ১৫ হাজার টন কাঁচামাল রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে এসব দেশ থেকে বাংলাদেশ প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে, যার বড় অংশই জ্বালানি পণ্য। তবে বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে নতুন জাহাজ আসা এবং জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আপনার মন্তব্য

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

অনুসরন করুন

সর্বশেষ খবর

আর্কাইভ

  • Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
     1234
    567891011
    12131415161718
    19202122232425
    262728293031