দিনের আলোয় তিনি সমাজসেবক। কখনো ঝাড়ু হাতে রাস্তা পরিষ্কার করছেন, কখনো ড্রেনের ময়লা তুলছেন, আবার কখনো দেয়ালের পোস্টার মুছে পরিচ্ছন্নতার বার্তা দিচ্ছেন। বস্তির গরিব মানুষকে নগদ টাকা দিয়ে সেই ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছেন অনুসারীদের দিয়ে। আগামী সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) ২০নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদপ্রার্থী হিসেবে এটি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ঢাকা মহানগর উত্তরের সদস্য ও সাবেক কাউন্সিলর আবুল কালাম আজাদের আগাম নির্বাচনী প্রচারণার অংশ। কিন্তু এই ‘উদার’ ও ‘নীতিবান’ ইমেজের আড়ালে মহাখালী এলাকায় গড়ে উঠেছে এক ভয়ঙ্কর চাঁদাবাজির সাম্রাজ্য, যার নিয়ন্ত্রক স্বয়ং আজাদ। একই সাথে তার বিরুদ্ধে উঠেছে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ নেতাদের পুনর্বাসনের গুরুতর অভিযোগ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মহাখালী ফুটপাত, কড়াইল বস্তি ও সাততলা বস্তিসহ পুরো এলাকার চাঁদাবাজ চক্রের মূল আশ্রয়দাতা আবুল কালাম আজাদ। এলাকা ভেদে চাঁদাবাজি সচল রাখতে তার রয়েছে আলাদা আলাদা বাহিনী। স্থানীয়রা জানান, মুখে নীতি কথা বললেও প্রতিদিন রাতে মহাখালী ওয়্যারলেস গেইটে আজাদের বাসভবনে বসে চাঁদাবাজদের গোপন বৈঠক। সেখানেই নির্ধারিত হয় দৈনিক ও মাসিক চাঁদার ভাগবাটোয়ারা।
সম্প্রতি মহাখালী গাউসুল আজম মসজিদের পাশে বটতলা এলাকায় আজাদের এক অভিনব চাঁদাবাজির চিত্র সামনে এসেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বনানী থানা বিএনপির এক সিনিয়র নেতা জানান, আজাদের নির্দেশে বটতলা এলাকার হকারদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের চাঁদা তুলে ফুটপাত সংস্কার করা হয়। সংস্কার শেষ হতেই সেখানে পুনরায় দোকানপাট বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশ্ন, তাহলে কি প্রশাসনের বা আজাদের লোক দেখানো উচ্ছেদ অভিযান শুধুই হকারদের কাছ থেকে নতুন করে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার কৌশল?
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বনানী থানা বিএনপির উক্ত সিনিয়র নেতা বলেন, “দলের নাম ভাঙিয়ে এভাবে ফুটপাত থেকে চাঁদা তোলা এবং নিজস্ব তহবিল না দেখিয়ে হকারদের টাকাতেই ফুটপাত সংস্কার করে বাহবা নেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত লজ্জাজনক। এতে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে।”
আজাদের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় গুরুতর অভিযোগটি হলো নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতাদের পুনর্বাসন। স্থানীয়দের দাবি, বিগত সরকারের পতনের পর ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের অন্তত শতাধিক আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের পদধারী নেতাকে নিজের ছত্রছায়ায় পুনর্বাসিত করেছেন আজাদ। এই নেতারা এখন বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় সেজে প্রকাশ্যে আজাদের সাথে ঘুরে বেড়ান এবং বিএনপির নাম ভাঙিয়ে এলাকায় দেদারসে চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসা চালাচ্ছেন।
অভিযোগের এখানেই শেষ নয়। আবুল কালাম আজাদ মহাখালী বাস টার্মিনাল মালিক সমিতির কার্যকরী সভাপতি। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, রাজনৈতিক ক্ষমতা ও ভয়ভীতি দেখিয়ে মহাখালী বাস টার্মিনাল শ্রমিক ইউনিয়নের মূল নেতাদের এলাকাছাড়া করেছে মালিক সমিতি। শ্রমিক নেতারা মামলা-হামলা ও প্রাণভয়ে কেউ আত্মগোপনে, আবার কেউ বিদেশে পালিয়ে আছেন। তারা যেন আর কোনোদিন টার্মিনালে ফিরতে না পারেন, তার সব ধরনের ছক কষেছে মালিক সমিতি। লক্ষ্য— পুরো টার্মিনালের চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ এককভাবে নিজেদের হাতে রাখা। বর্তমানে তাদের এই একচ্ছত্র চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পাচ্ছেন না কেউ।
এসব অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে আবুল কালাম আজাদের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “এসব আমার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও কিছু ঈর্ষাপরায়ণ লোকের সাজানো গল্প। আমি এলাকায় শুধু সমাজসেবামূলক কাজ করছি। কোনো চাঁদাবাজি বা আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনের সাথে আমার সম্পর্ক নেই। টার্মিনালের শৃঙ্খলা ফেরাতেই আমরা মালিক সমিতি কাজ করছি, কোনো জোরজুলুম করা হচ্ছে না।”
তবে মহাখালী এলাকার সাধারণ মানুষ ও সাধারণ দলীয় নেতা-কর্মীরা এই ত্রাসের রাজত্ব থেকে মুক্তি চান। তারা অবিলম্বে এই সুনির্দিষ্ট অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত এবং আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহলের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।











